মাল্টিভার্স: অনন্ত মহাবিশ্বের সন্ধানে
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا ۖ مَّا تَرَىٰ فِي خَلْقِ الرَّحْمَـٰنِ مِن تَفَاوُتٍ ۖ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ
তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিতে কোন তফাত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টিফেরাও; কোন ফাটল দেখতে পাও কি?
ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ
অতঃপর তুমি বার বার তাকিয়ে দেখ-তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (সূরাহ মুলক, আয়াতঃ ৩-৪)।
“বিশ্ব বলিতে পূর্বে কিছুই ছিলনা”। (ফাতওয়ায়ে সিদ্দিকীন, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৭৪, কুরআন হাদীস রিসার্চ সেন্টার (ফুরফুরা দরবারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান), প্রকাশনায়ঃ ইশায়াতে ইসলাম, কুতুবখানা, মার্কাজে ইশায়াতে ইসলাম, ২/২, দারুস সালাম, মীরপুর, ঢাকা-১২১৬), প্রকাশকালঃ সাবান-১৪২০হিজরি, নভেম্বর ১৯৯৯ ঈসায়ী “গোটা সৃষ্টিকূলের মধ্যে আল্লাহ তাআলার কুন ফাইয়া কুনের তাজাল্লীই বিরাজমান” (প্রাগুক্ত পৃঃ ৩৮)।
“আসমান-যমীন, আরশ কুরসী লাওহ-কলম, গাছ পালা, বৃক্ষ লতা, এক কথায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য যত কিছু রয়েছে “সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ” (প্রাগুক্ত পৃঃ ৩৩)। “আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বস্তুকে পূর্ব উপাদান ব্যতীত সৃষ্টি করেছেন” (প্রাগুক্ত পৃঃ ১৬২(আল্লাহপাক) “বিশেষ মুছলেহাতের কারণে প্রথমে বিনা উপাদানে উপকরণে সৃষ্টি করে, সেই সব উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন বস্তু সৃষ্টি করার ব্যবস্থা চালু করেছেন”(সূত্রঃ ফাতাওয়ায়ে সিদ্দিকীন, ১-৪ খন্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩)উল্লেখ্য, এক সময় কেবলই আল্লাহ (ﺎﻠﻠﻪ) আর আল্লাহ-ই ছিলেন। মহান আল্লাহ ব্যতিত সৃষ্টি (ﻣﺨﻟﻖ) সত্বার কোন অস্তিত্ব কখনই ছিল না। কোন এক মহাসন্ধিক্ষণে আল্লাহপাক তাঁর কুদরতি এক মহাপরিকল্পনার (Master Plan) অধীনে ‘কুন’ হয়ে যাও‘’- এই কুদরতি আদেশ বা হুকুমবলে সম্পূর্ণ ‘নাই’ (Nil/Zero) থেকে কোন প্রকার জাগতিক তত্ত্ব, তথ্য, উপাত্ত, সূত্র, আইন-কানুন, বিধি-বিধান থেকে সম্পূর্ণ পুতঃপবিত্র (সুবহান) এবং অনির্ভরশীল(স্বমাদ) হয়ে সৃষ্টি করলেন এক মহাসৃষ্টি সত্বা (Great Creation) বা ﻣﺨﻟﻖ)-যাতে সম্মিলিতভাবে (Combined) নিহিত ছিল আকাশ/মহাকাশ[(ﺍﻠﺴﺎﻮﺍﺕ)( (Sky)] ও জমিন [ﻼﻠﺭﺽ Earth (পৃথিবী) আবার কোন এক বিশেষ মুহুর্তে তা পৃথক করে আজকের আসমান ও জমিন-এই দু’টি পৃথক পৃথক সত্বা সৃষ্টি করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক আল কোরআনে ফরমান, “কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অত:পর আমি উভয়কে খুলে দিলাম”। (সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০নং আয়াত “উভয় (আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী )-কে খুলে দিলাম”-খুলে দেয়ার এই পরম-চরম মুহুর্তটিকেই খুব সম্ভবতঃ বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘মহাবিস্ফোরণ’ (Big Bang) এবং খুলে দেয়ার পূর্ব মুহুর্তের (আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী একত্রিত রূপ-কে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয়েছে Highest Energetic Radiation.
উল্লেখ্য যে, মহাবিস্ফোরণের পর আকাশমন্ডলীর এ অবস্থাকে সূরা হা-মিম-আস্- সিজদা’র ১১নং আয়াতে ‘দুখান’ নামে অভিহিত করে আল্লাহ পাক ফরমান: “অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যা ছিল ধুম্রকুঞ্জ (দুখান)।” (পবিত্র কোরআনুল করীমঃ তফসীর মাআরেফুল ক্বোরআন, পৃষ্ঠাঃ ১২৯৪)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা নিম্নরূপ : (১) বয়ানুল কোরআনে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেনঃ আমার মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ধুম্রকুঞ্জ এর আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধুম্রকুঞ্জ এর উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। (পবিত্র কোরআনুল করীমঃ তফসীর মাআরেফুল ক্বোরআন, পৃষ্ঠাঃ ১১ (২) পবিত্র কুরআনের মতে, বিশ্ব জগৎ আদিতে ছিল একটি বিশালকার একক পিন্ডাকৃতির বস্তু-সুক্ষ্ণাতি সুক্ষ্ণ অণু-পরমাণু বিশিষ্ট গোলক-যাকে দুখান বলা হয়েছে। এই দুখান হলো স্তর বিশিষ্ট এমন এক গ্যাস জাতীয় পদার্থ যা স্থিরভাবে ঝুলানো এবং যার মধ্যে বস্তু-সুক্ষ্ণাতি সুক্ষ্ণ অণু কণা উচ্চতর বা নিম্নতর চাপের দরুণ কখনও কঠিন, এমনকি কখনও বা তরল অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। মহাকালের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই মহাপিন্ডটি খন্ড বিখন্ড হয়ে তৈরী হয়েছে এক একটি নীহারিকা বা ছায়াপথ এবং সেই সব ছায়াপথ সূর্যের মত কোটি কোটি নক্ষত্র নিয়ে একটা একটা পৃথক জগৎ রূপে মহাশূণ্যে সঞ্চারমান। আদি গ্যাসীয় পিন্ডের খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়া বিশালকার টুকরাগুলি কালক্রমে আবার একীভুত হয়ে সূর্যের মত এক একটি নক্ষত্র সৃষ্টি করেছে। ...... বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ব সৃষ্টির আদিতে ছিল ‘নীহারিকা’ বা ‘নেবুলা’ যা মূলতঃ গ্যাসীয় ধুম্রপিন্ড এর অনুরূপ। দেখা যাচ্ছে, বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কৃত তথ্যের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।” {সূত্র: কম্পিউটার ও আল-কুরআন)।
ﻻ ﻴﻌﺰﺐ ﻋﻨﻪ ﻣﺜﻗﺎﻞ ﺬﺭﺓ ﻓﻰ ﺍﻠﺴﻣﻮﺖ ﻮﻻ ﻓﻰ ﺍﻻﺭﺽ ﻮﻻ ﺍﺼﻐﺭﻤﻦ ﺬﻠﻚ ﻮﻻ ﺍﻜﺑﺮﺍﻻ ﻓﻰ ﻜﺘﺐ ﻤﺑﻴﻦ অর্থঃ “তিনি অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু যাঁর অগোচর নয়; ওর প্রত্যেকটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে লিপিবদ্ধ।” (সূরাহ্ সাবা, আয়াতঃ ৩)
“পবিত্র কুরআনের মতে, বিশ্ব জগৎ আদিতে ছিল একটি বিশালকার একক পিন্ডাকৃতির বস্তু-বস্তু-সুক্ষ্ণাতি সুক্ষ্ণ অণু পরমাণু বিশিষ্ট গোলক।”(সূত্র: কম্পিউটার ও আল-কুরআন, কুরআন-হাদিস রিসার্চ সেন্টার, ইশায়াতে ইসলাম কুতুবখানা, দারুস্ সালাম, ঢাকা)। “বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীগণ পরমাণুবাদের সমর্থক” (সূত্রঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদাঃ ফতেহ্ আলী মোহাম্মাদ আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী আল্ কোরাইশী, নেদায়ে ইসলাম, বর্ষঃ ৭৩, সংখ্যা-৬, মহররম-সফর ১৪৩আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির আলোকে মহাবিশ্ব তত্ত্ব (Cosmology)
(সূত্রঃ Encyclopedia)
স্থান ও সময় এবং এদের অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয় নিয়েই মহাবিশ্ব ।। পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ , সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র , জ্যোতির্বলয়স স্থান ও এদের অন্তর্বর্তীস্থ গুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা ও শূণ্যস্থান (মহাকাশ) - যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয় - এমন সবপদার্থ ও শক্তি মিলে যে জগৎ তাকেই বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব ।
পুরো বিশ্বের আকার অজানা হলেও এর উপাদান ও সৃষ্টিধারা নিয়ে বেশ কয়েকটি hypotheses বিদ্যমান[ মহাবিশ্বের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিষয়কে বলে বিশ্বতত্। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সুদূরতম প্রান্তের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক গবেষণায় মনে হয় মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রক্রিয়াই তার সৃষ্টি থেকেই একই ধরণের প্রাকৃতিক নিয়ম ও কয়েকটি নির্দিষ্ট ধ্রুবক দ্বারা নির্ধারিতবিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব অনুসারে এর আয়তন ক্রমবর্ধমান। সম্প্রতি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন তত্ত্বে আমাদের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরো অনেক মহাবিশ্ব থাকার অর্থাৎঅনন্ত মহাবিশ্ থাকার সম্ভাবনা অবশ্যম্ভাবী বলে ধারণা করা হচ্ছে। পবিত্র ইসলাম মতে, আল্লাহপাকের সৃষ্টি সত্বায় অন্ততঃ সাত সাতটি মহাকাশ বিদ্যমান যা একটির চেয়ে অপরটি তুলনামূলকভাবে অকল্পনীয়ভাবে বিরাট-বিশাল।
মহা বিশ্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
প্রাচীন কালে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য নানাবিধ বিশ্বতত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হত। পুরাতন গ্রিক দার্শনিকরাই প্রথম এই ধরণের তত্ত্বে গাণিতিক মডেলের সাহায্য নেন এব পৃথিবী কেন্দ্রিক একটি মহাবিশ্বের ধারণা প্রণয়ন করেন। তাঁদের মডেলে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত।উল্লেখ্য, বিশ্বতত্ত্বের ইসলামী ধারণামতে, পবিত্র ক্বাবা পৃথিবীর মধ্যস্থলে অবস্থিত। আবার পবিত্র ক্বাবার ঠিক বরাবর উর্ধ্বজগতে অবস্থিত সাত আসমানে বায়তুল মামুর বিদ্যমান। নিউটনের গতি ও মহাকর্ষ সংক্রান্ত গভীর ধারণা পর্যবেক্ষণের সাথে সৌরকেন্দ্রিক জগতের সামঞ্জস্য নির্ধারণ করে। ধীরে ধীরে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করেন সূর্যের মতই কোটি কোটি তারা দিয়ে একটি গ্যালাক্সি গঠিত। কয়েক শত বছর পূর্বে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সমগ্র মহাবিশ্ব মানে শুধুমাত্র আমাদের এই ছায়াপথ গ্যালাক্সিটিই। ১৯২০র দশকে উন্নত দুরবীনের কল্যাণে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন ছায়াপথের বাইরে অন্য গ্যালাক্সিদের।
সেই কোটি কোটি গ্যালাক্সিদের মধ্যে ছায়াপথের মতই কোটি কোটি তারাদের অবস্থান। সেই সমস্ত গ্যালাক্সিদের থেকে আগত আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণে বোঝা গেল সেই গ্যালাক্সিগুলি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর সহজতম ব্যাখ্যা হল গ্যালাক্সিদের মধ্যে স্থানের প্রসারণ হচ্ছে এবং প্রতিটি গ্যালাক্সিই অন্য গ্যালাক্সি থেকে দূরে সরছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা হল সুদূর অতীতে সমস্ত গ্যালাক্সিগুলি বা তাদের অন্তর্নিহিত সমস্ত পদার্থই একসাথে খুব ঘন অবস্থায় ছিল এবং কোন মহা বিস্ফোরণের ফলে বস্তুসমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিস্ফোরণের নাম দেওয়া হল বিগ ব্যাং।
Highest Energetic Radiation
বিগ ব্যাং মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল একটা ভীষণ ঘন ও উষ্ণ দশা থেকে। সেই সময় থেকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ চলেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা শুরুর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মহাবিশ্বের অতিস্ফিতী (inflation) হয়- যা কিনা দেশ বা স্থানের প্রতিটি অংশে প্রায় একই তাপমাত্রা স্থাপন করতে সাহায্য কর এই সময়ে সুসম ঘনত্বের মাঝে হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যত গ্যালাক্সি সৃষ্টির বীজ তৈরি হয়। মহাকর্ষ শক্তি মাধ্যমে সম্প্রসারণের বিরূদ্ধে বস্তুজগতকে আকর্ষিত করে গ্যালাক্সি সৃষ্টির পেছনে কৃষ্ণ বা অন্ধকার বস্তুর বিশেষ ভূমিকা আছে। অন্যদিকে মহাবিশ্বের বর্তমান প্রসারণের মাত্রার ত্বরণের জন্য কৃষ্ণ বা অন্ধকার শক্তি বলে একটি জিনিসকে দায়ী করা হচ্ছে। তাত্ত্বিক ভাবে কৃষ্ণ বস্তু মহাকর্ষ ছাড়া অন্য বলগুলোর সাথে (তড়িৎ-চুম্বকীয়, সবল ও দুর্বল) খুব অল্পই বিক্রিয়া করে সেই জন্য ডিটেকটর দিয়ে তাকে দেখা মুশকিল। বর্তমান মহাবিশ্বের মূল অংশই হচ্ছে কৃষ্ণ শক্তি, বাকিটা কৃষ্ণ বস্তু। আমরা চোখে বা ডিটেকটরের মাধ্যমে যা দেখি তা মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশেরও কম।
বর্তমান মহাবিশ্বের উপাদান সমূহ
মহাবিশ্বের আকার বিশাল। বর্তমান বিশ্বতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩.৭৫ বিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান অংশের "এই মুহূর্তের" ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোক বছর। মহাবিশ্বের ব্যাস ১৩.৭৫ x ২ = ২৭.৫০ বিলিয়ন আলোক বছরের চাইতে বেশী। তাছাড়া, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বকে যদি একটা গোলক কল্পনা করা হয় তবে তার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোক বর্ষ। যদিও সেই দূরত্বে অবস্থিত গ্যালাক্সি থেকে এই মুহূর্তে যে বিকিরণ বের হচ্ছে তা আমরা কখনই দেখতে পাব না। জ্যোতির্বিদরা মনে করছেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বে প্রায় ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে। এই গ্যালাক্সিরা খুব ছোটও হতে পারে, যেমন মাত্র ১০ মিলিয়ন (বা ১ কোটি) তারা সম্বলিত বামন গ্যালাক্সি অথবা খুব বড়ও হতে পারে, যেমনঃ দৈত্যাকার গ্যালাক্সিগুলিতে ১০০০ বিলিয়ন তারা থাকতে পারে (আমাদের গ্যালাক্সি ছায়াপথের ১০ গুণ বেশী)।
স্থানীয় গ্যালাক্সিপুঞ্জ আমাদের ছায়াপথের ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত স্থানীয় গ্যালাক্সিগুলো। এই স্থানীয় গ্যালাক্সি দলের মধ্যে বড় তিনটি সর্পিল গ্যালাক্সিঅ্যান্ড্রোমিডা বা M31 এবং M33 একটি মহাকর্ষীয় ত্রিভুজ তৈরি করেছে। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের নিকটবর্তী বড় গ্যালাক্সি। এর দূরত্ব হচ্ছে ২.৫ মিলিয়ন বা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। স্থানীয় দলের মধ্যে বেশীর ভাগ গ্যালাক্সিই বড় ম্যাজিল্লান মেঘের মত অনিয়মিত গ্যালাক্সস্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জ।
এই মহাপুঞ্জের কেন্দ্র কন্যা গ্যালাক্সি দল হওয়াতে তাকে কন্যা মহাপুঞ্জ বা মহাদল বলা হয়। কন্যা গ্যালাক্সি পুঞ্জ আমাদের থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বা ৬.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই ধরণের মহাপুঞ্জগুলো ফিতার আকারের মত। সাবানের বুদবুদ দিয়ে এই ধরণের গ্যালাক্সিপুঞ্জ গঠনের মডেল করা যায়। দুটো বুদবুদের দেওয়াল যেখানে মেশে সেখানেই যেন গ্যালাক্সির ফিতা সৃষ্ট। । কন্যা গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জসহ ৫০ মেগাপার্সেকের (৫০ মিলিয়ন পার্সেক বা ১৬৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)মধ্যে সমস্ত পদার্থ ৬৫ মেগাপার্সেক দূরের নর্মা পুঞ্জের (Abell 3627)দিকে ৬০০ কিমি/সেকেন্ডে ছুটে যাচ্ছে। বৃহত্তর স্কেলে গ্যালাক্সি সৃষ্টির জন্য ব্যারিয়ন ধ্বনি স্পন্দন (Baryon Acoustic Oscillation) যথেষ্ট সফল হয়েছে। এই মডেল অনুযায়ী গ্যালাক্সি পুঞ্জ মোটামুটি ১০০ মেগাপার্সেক (~৩০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)স্কেলে বা স্থান জুড়[১৪]
মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনে আরো একধাপ
মহাজাগতিক ঘর্ষণ বা বিগ ব্যাং-এর পরে মহাকাশ থেকে মাধ্যাকর্ষণের যে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, প্রথমবারের মতো তা আবিষ্কৃত হয়েছে ৷ এর থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক অজানা রহস্যের সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। মহাজাগতিক ঘর্ষণ বা বিগ ব্যাং ঠিক কত বছর আগে হয়েছিল,আ মহা সৃষ্টি ঠিক কত কোটি বছর আগে – এটা নিয়ে আছে নানা জল্পনা-কল্পনা ৷ হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টারের জ্যোতির্পদার্থবিদরা জানান, যে তরঙ্গ প্রবাহের সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন, তা একটি মাইল ফলক। ১৪শ' কোটি বছর আগে এই তরঙ্গের উৎপত্তি হয়েছিল বলে জানান তাঁরা ৷ এর সাথে আলবার্ট আইনস্টাইনের এক শতকের পুরোনো আপেক্ষিক তত্ত্বের মিল পাওয়া যায় ৷ এ থেকে এই প্রথম ‘কসমিক ইনফ্লেশন' বা মহাজাগতিক স্ফীতির সরাসরি তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেল ৷ শুধু তাই নয়; এই তত্ত্ব থেকে এ কথা সহজেই বলা যায় যে, মহাবিশ্ব ‘চোখের পলক ফেলার সময়ে একশ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বিস্তার লাভ করেছে ৷ দক্ষিণ মেরুতে অবস্থানরটেল সাহায্যে এই আলোক তরঙ্গ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে ৷
আমাদের চেনা মহাবিশ্ব যে কত বিশাল সেটা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। ২০২১ সালের শেষ দিকে মহাশূন্যে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পাঠানো হয়েছে। এটি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের চেয়েও একশ গুণ বেশি শক্তিশালী। অতি সাধারণ গ্যালাক্সি হলো আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি (আকাশ-গঙ্গা ছায়াপথ)। এটি আমাদের আবাসস্থল। আমাদের এই নিজস্ব গ্যালাক্সিটিতে ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। সূর্য হলো তারই মধ্যে একটি অতি সাধারন মাঝারি সাইজের নক্ষত্র।এই নক্ষত্রটিকেই কেন্দ্র করে আমাদের সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা পৃথিবী। সূর্যের আটটি গ্রহের একটি হলো আমাদের পৃথিবী। হিসেব করে দেখা গেছে, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে এক বিলিয়ন ট্রিলিয়ন (একের পিঠে বাইশটি শুন্য দিলে যা হয়) নক্ষত্র রয়েছে। সংখ্যাটি যে অত্যন্ত বিশাল সেটা বলাই বাহুল্য।
অনেকে বলেন, পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্র সৈকতে যে পরিমাণ বালুকণা রয়েছে, মহাবিশ্বে তার চেয়েও অনেক বেশি নক্ষত্র রয়েছে। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের পৃথিবীর অবস্থান যে অতি অকিঞ্চিৎকর সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশাল এই মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের অবস্থান অতি তুচ্ছ এবং নগণ্য।
মাত্র একশো বছর আগেও মহাবিশ্ব বলতে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকেই বুঝতেন। এর বাইরে যে এতো অসংখ্য গ্যালাক্সি রয়েছে সে সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কোন ধারণাই ছিল না। তাঁরা দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোকে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্তর্গত নীহারিকা (Nebula) মনে করতেন। ১৯২৩ সালে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে সর্বপ্রথম প্রমাণিত হয়, অ্যানড্রোমিডা (Andromeda) কোন নেবুলা বা নীহারিকা নয়, এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে একটি স্বতন্ত্র গ্যালাক্সি। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব হলো ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। তার মানে হলো, এই গ্যালাক্সিটি থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছাতে সময় লাগে ২.৫ মিলিয়ন বছর। কিন্তু মহাজাগতিক স্কেলে অ্যানড্রোমিডা গ্যালাক্সিটি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি অতি নিকট প্রতিবেশী।
টেলিস্কোপ প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি হওয়ার ফলে ক্রমান্বয়ে আবিষ্কৃত গ্যালাক্সি থেকে পাওয়া আলোক রশ্মির বর্ণালী বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছেন, গ্যালাক্সিগুলো খুব দ্রুতই পরস্পরের কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে বোঝা যাচ্ছে মহাবিশ্ব মোটেই স্থির নয়। বরং সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্ব ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। তার মানে হলো, আমরা যদি সময়ের বিপরীতে সুদূর অতীতে ফিরে যাই, তাহলে একসময় দেখতে পাবো, সমস্ত গ্যালাক্সির যাবতীয় বস্তু একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত অবস্থায় ছিলো। এর পেছনে ফিরে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। সময় এখানে এসে থেমে গেছে। এই অবস্থাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সিঙ্গুলারিটির ভেতরে স্থান, কাল, বস্তু এবং শক্তি সবই একীভূত অবস্থায় ছিল। এখান থেকেই মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, এখন থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, এই সিঙ্গুলারিটির ভেতর একটি ঘটনা ঘটেছিলো। এর নাম হলো বিগ ব্যাং (Big Bang) অর্থাৎ মহাবিস্ফোরণ,
এটি ছিলো একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার ফলে মহাবিশ্বে স্থান-কাল এবং বস্তুর সৃষ্টি হয়েছিলো। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এক ধরনের মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে। এর নাম হলো, কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB)। বিগ ব্যাংয়ের ফলে উদ্ভূত এই মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ মহাবিশ্বের সবদিকে সমভাবে ছড়িয়ে আছে। ১৯৬৪ সালে দুজন মার্কিন রেডিও প্রকৌশলী আকস্মিকভাবেই তাঁদের স্থাপিত এন্টেনায় এই বিকিরণটি আবিষ্কার করেছিলেন।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিগ ব্যাংয়ের নির্গত শক্তি থেকেই ধাপে ধাপে মহাবিশ্বের যাবতীয় বস্তুকণার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথম তিনটি মিনিট ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহাবিশ্বের যাবতীয় প্রাথমিক বস্তুকণা এই প্রথম তিন মিনিটের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিলো। বিগ ব্যাংয়ের মহাশক্তি থেকে প্রাথমিক বস্তুকণার রূপান্তর কিভাবে হয়েছিল তার ব্যাখ্যা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, এর ফলে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় প্রচন্ড শক্তি নির্গত হয়েছিলো। এক হাজার ট্রিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এই মহাশক্তি থেকে খুব দ্রুতই কিছু প্রাথমিক বস্তুকণার উদ্ভব হয় যা প্রথম তিন মিনিটের মধ্যেই কয়েক ধাপে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়েছিলো। আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত ভর-শক্তির সমীকরণে (E = mc2) দেখিয়েছেন, বস্তুকে যেমন শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব, তেমনি শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তরিত করা অসম্ভব নয়। মহাবিশ্বের সূচনায় এই অসম্ভবটিই সম্ভব হয়েছিলো। এর পরপরই মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়, যা এখনো ক্রমেই প্রসারিত হয়েই চলেছে। পরবর্তীতে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণু মহাকর্ষের ফলে পুঞ্জীভূত হয়ে বিভিন্ন গ্যালাক্সি, নেবুলা এবং নক্ষত্রের জন্ম দিয়েছে। এগুলো এখন আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বের অংশ। বিগ ব্যাং হলো বিজ্ঞানীদের কাছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সবচাইতে পছন্দনীয় এবং গ্রহণযোগ্য মডেল।
বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বেশ কিছু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী আছেন, যারা মনে করেন, আমাদের চেনা মহাবিশ্বই শেষ কথা নয়। এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য অচেনা মহাবিশ্ব। এই অনন্ত মহাবিশ্বের নাম তাঁরা দিয়েছেন, মাল্টিভার্স (Multiverse)। এসব অচেনা মহাবিশ্বগুলো আমাদের চেনা মহাবিশ্বের সমান্তরাল কিন্তু এদের প্রাকৃতিক নিয়মকানুনগুলো আমাদের চেনা মহাবিশ্বের মত নয়, সম্পূর্ণ আলাদা। অনেকে একে বলেন, প্যারালাল ইউনিভার্স। একে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান কোন কোন সময় কল্পকাহিনীকেও হার মানিয়ে দেয়। বর্তমান যুগের কসমোলজিতে মাল্টিভার্স তত্ত্ব এমনি এক আশ্চর্য বিষয়।
আমরা জানি, পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাদের জগৎটি বড়ই বিস্ময়কর এবং অদ্ভুত। এই জগতের নিয়ামক হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মগুলো এখানে খাটে না। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুসারে কোন বস্তুকণার অবস্থান নিশ্চিত ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। মোদ্দা কথা হলো, কোয়ান্টাম জগতে একটি বস্তুকণা একই সময়ে একাধিক অবস্থানে থাকতে পারে। কোয়ান্টাম বস্তুকণার এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয়, সুপারপজিশন। বস্তুকণার ভিন্ন ভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থান আমরা একই সাথে পর্যবেক্ষণ করতে পারিনা। যেমন একটি বস্তুকণা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কণা হিসেবে থাকতে পারে, আবার তরঙ্গ হিসেবেও থাকতে পারে। কিন্তু একই সাথে আমরা কখনও এ দুটো অবস্থান দেখতে পাই না। বস্তুকণার কোয়ান্টাম অবস্থান নির্ণয় করতে হয় এর সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিটি দিয়ে। আলবার্ট আইনস্টাইন অবশ্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। তিনি সরাসরি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর মহাবিশ্বকে নিয়ে পাশা খেলেন না। বলাই বাহুল্য তাঁর কাছে ‘সম্ভাব্যতা’ ব্যাপারটা খুব গোলমেলে ঠেকেছিল।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একজন দিকপাল ছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার। ১৯২৬ সালে শ্রোডিঙ্গারই সর্বপ্রথম তাঁর ওয়েভ ফাংশন সমীকরণের সাহায্যে বস্তুকণার কোয়ান্টাম অবস্থানের সম্ভাব্যতা নির্ণয় করেছিলেন। কিন্তু আমরা যখনই কোনো বস্তুকণাকে পর্যবেক্ষণ করি তখনই তার কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশনের পরিসমাপ্তি ঘটে। শ্রোডিঙ্গার বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের পারিপার্শ্বিক দৃশ্যমান জগতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মগুলি প্রয়োগ করলে সমস্যা দেখা যাবে। তিনি বিড়াল নিয়ে একটি কাল্পনিক পরীক্ষার মাধ্যমে এটি জনসম্মুখে তুলে ধরেছিলেন। এই কাল্পনিক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন একটি বন্ধ বাক্সের মধ্যে একটি বিড়ালের পক্ষে কোয়ান্টাম জগতে জীবিত এবং মৃত দুই অবস্থায়ই থাকা সম্ভব। যেটি বাস্তবে অসম্ভব। শ্রোডিঙ্গার বিড়াল নিয়ে তাঁর এই কাল্পনিক পরীক্ষার মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন, বস্তুকণাদের জগতে সুপারপজিশনের ধারণাটি প্রয়োগ করা গেলেও, আমাদের দৃশ্যমান পারিপার্শ্বিক জগতে এর প্রয়োগ বাস্তবসম্মত নয়। এই দুই জগতের নিয়ম বড়ই আলাদা।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সে অবশ্য আরও গোলমেলে ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে। যেমন ধরুন, কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এনট্যাঙ্গলমেন্ট বলে একটি ব্যাপার আছে। সোজা বাংলায় এর মানে হলো, পরস্পর জড়িয়ে থাকা। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রকৃতিতে দুটি বস্তুকণার উদ্ভব এমনভাবে হতে পারে, যেখানে একটি বস্তুকণার কোয়ান্টাম চরিত্র ব্যাখ্যা করলে অন্য বস্তু কণাটির কোয়ান্টাম চরিত্রও জানা যায়। যদিও আপাতদৃষ্টিতে দুটি বস্তুকণার মধ্যে সরাসরি কোন যোগাযোগ নেই এবং তাদের মধ্যে অনেক দূরত্বও রয়েছে। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য বন্ধনে কোয়ান্টাম জগতের একটি বস্তুকণা অন্য একটি দূরবর্তী বস্তুকণার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পরিভাষায় একে বলা হয় এনট্যান্ঙ্গেলমেন্ট। আইনস্টাইন একে বলেছিলেন, স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট ডিসটেন্স; এটা অনেকটা ভুতুড়ে ব্যাপারের মত। এখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মাবলীর পার্থক্য দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা বস্তুকণার চরিত্র নিয়ে যতই গবেষণা করেছেন তাদের কাছে কোয়ান্টাম কণাদের অনিশ্চয়তার এবং জড়িয়ে থাকার বিষয়টি ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোয়ান্টাম জগতের বস্তুকণাদের এই অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা নানাভাবে দিয়েছেন। তবে এর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন, হিউ এভারেট নামে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির একজন গবেষক। ১৯৫৩ সালে তিনি বলেছিলেন, কোয়ান্টাম কণাদের এই দ্বৈত আচরণ আসলে ঘটছে দুটো ভিন্ন মহাবিশ্বে। পর্যবেক্ষক দুটো ভিন্ন মহাবিশ্ব থেকে একে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সেজন্য আমরা একই সাথে বস্তুকণার দুটো অবস্থা দেখতে পাই না। দুটি ভিন্ন মহাবিশ্বে কোয়ান্টাম বস্তুকণারা পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকলেও, দৃশ্যমান জগতে পর্যবেক্ষক পরস্পরের সাথে সংযুক্ত নয়। তাঁর এই বহু জাগতিক (multi-world) ব্যাখ্যাটি সে যুগের পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান যুগের একদল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির তত্ত্বের সাথে একীভূত করে মাল্টিভার্স বা অনন্ত মহাবিশ্বের ধারণাটি দিয়েছেন। আগেই বলেছি একটি বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিলো। কিন্তু বিগ ব্যাং কেন হয়েছিলো সে ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে।
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, বিগব্যাংয়ের ঠিক পরপরই মহাবিশ্ব ব্যাপক হারে স্ফীত (inflation) উঠেছিলো। এর কারণ হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছেন মহাকর্ষ বলকে। যদিও আমরা জানি মহাকর্ষ বল হলো আকর্ষণধর্মী, কিন্তু বিগব্যাংয়ের পরপরই প্রচন্ড শক্তির প্রভাবে মহাকর্ষ বল বিকর্ষণধর্মী হয়ে গিয়েছিল। এই বিকর্ষণধর্মী মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মহাবিশ্ব অতি দ্রুত হারে স্ফীত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের হিসেবে, জ্যামিতিক হারে এই ব্যাপক স্ফীতিটি হয়েছিলো বিগব্যাং ঘটার ১০-৩৭ থেকে ১০-৩৫ সেকেন্ডের মধ্যে। এই অতি সামান্য সময়ের মধ্যেই মহাবিশ্বের আয়তন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অতি সামান্য সময়ে এই অতি দ্রুত স্ফীতির হার সর্বত্র সুষম ছিলনা। সেজন্য স্ফীতি কালীন সময়ে বুদবুদের মত অসংখ্য বলয় সৃষ্টি হয়েছিলো। এই বলয়গুলোই পরবর্তীতে ভিন্ন ভিন্ন মহাবিশ্ব হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। এর ফলে একটি বিগ ব্যাং থেকেই একটির পরিবর্তে অনন্ত মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এসব মহাবিশ্বগুলো একে অপরের কাছে দৃশ্যমান নয়। এদের প্রাকৃতিক নিয়মগুলোও ভিন্ন। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতের বস্তুকণার মতই এই মহাবিশ্বগুলো সমান্তরালভাবে বিরাজমান। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা অনন্ত মহাবিশ্বের সংখ্যাও হিসেব করে বের করেছেন। সংখ্যাটি হলো (১০১০)১৬। বলাই বাহুল্য, সংখ্যাটি অবিশ্বাস্য রকমের বড়। অনন্ত মহাবিশ্ব যে কত বিশাল সেটা ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে ধারণা করাটি অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমান যুগের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত স্ট্রিং থিওরি অনুযায়ী আমাদের দৃশ্যমান ত্রিমাত্রিক জগৎটাই সবকিছু নয়, এর বাইরেও জগত রয়েছে। স্ট্রিং থিওরী মোতাবেক মহাবিশ্বে মোট এগারোটি ডাইমেনশন রয়েছে। দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং উচ্চতা, এই তিনটি দৃশ্যমান স্থানিক মাত্রার অতিরিক্ত মাত্রাগুলোকে বলা হয় হাইপারস্পেইস (Hyperspace)। এই উচ্চমাত্রার স্থানগুলো রয়েছে আমাদের ধরাছোঁয়া বা দৃষ্টিসীমার বাইরে। সেজন্য বলা যায়, স্ট্রিং থিওরী অনুযায়ী মাল্টিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্সের ধারনাটি অমূলক নয়। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার জন্য একে প্রমাণ করাও সম্ভব নয়।
সূত্র: সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান
মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহা বিস্ময় স্ট্রিং বিশেষজ্ঞদের মতে, কণাবাদী পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল যেসব কণিকাদের নিয়ে কাজ করে, স্ট্রিং থিওরি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসব কণর সাথে চমৎকারভাবে মহাকর্ষের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, মহাজাগতিক সবকিছুর তত্ত্ব হিসাবে স্ট্রিং থিওরি সকল কাজের কাজী হওয়ার দাবী রাখে অর্থাৎ এই তত্ত্বের নিজস্ব গাণিিতিক মডেলের সাহায্যে স্ট্রিং থিওরি প্রকৃতিতে বিদ্যমান চারটি মৌলিক বল, সকল প্রকার শক্তি ও পদার্থের যেকোনো অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। বস্তুতঃ স্ট্রিং থিওরীর ধারণাগুলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এবং কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি ও কোয়ান্টাম গ্রাভিটির (মহাকর্ষের কোয়ান্টাম রুপ) সকল ধোঁয়াশা দূর করে আমাদের পুরাতন পৃথিবীতে এক নতুন পদার্থবিজ্ঞান উপহার দিচ্ছে যা সত্যি অভিনন্দনযোগ্য।তবে নিউটনের ক্ল্যাসিক্যাল বল বিজ্ঞান ছাড়িয়ে কোয়ান্টাম ম্যাকানিকস নামক সুপার ডিজিটাল যুগেও সম্ভবপর হচ্ছে না মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় মহাকর্ষের স্বরূপ উন্মোচনের। উপরন্ত্ত অদৃশ্যমান মহাজাগতিক ডার্ক এনার্জি আর ডার্ক ম্যাটারের সরব উপস্থিতি বিজ্ঞান...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন